হাওজা নিউজ এজেন্সি: আরব ও ইরানের পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টি বুঝতে কতিপয় বিষয়ে দৃষ্টিপাত করা যাক:
বর্তমান প্রেক্ষাপট: আগ্রাসনের মুখে স্বচ্ছ নীতি
বর্তমান পরিস্থিতিতে, যেখানে ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সরাসরি আগ্রাসনের মুখোমুখি, সেখানে আরব দেশগুলোর প্রতি তেহরানের আচরণও একই কাঠামোতে বোঝা উচিত। ইরান বারবার ঘোষণা করেছে যে তার প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূখণ্ডে যুদ্ধ সম্প্রসারণের কোনো অভিপ্রায় নেই। একইসঙ্গে ইরানের প্রতিরক্ষা নীতিতে একটি সুস্পষ্ট নীতি বিদ্যমান: হুমকির উৎসকে জবাব দেওয়া। অন্য কথায়, যদি কোনো আরব দেশের কোনো স্থান ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর ঘাঁটিতে পরিণত হয়, তবে তা সংঘাতের সমীকরণে চলে আসবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ইরানের পদক্ষেপ আয়োজক দেশের বিরুদ্ধে নয়, বরং আক্রমণের উৎসের বিরুদ্ধে নির্ধারিত হয়।
আঞ্চলিক জটিলতায় এক গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য
আঞ্চলিক জটিল গণমাধ্যম পরিবেশে এই পার্থক্যটি কখনও কখনও উপেক্ষিত হলেও ইরানের আচরণ বোঝার জন্য এটি অপরিহার্য। ইরান স্পষ্টভাবে জানাতে চেয়েছে যে আঞ্চলিক দেশগুলোর—বিশেষ করে তার আরব প্রতিবেশীদের—নিরাপত্তা তেহরানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, এবং কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনা সৃষ্টি হয় বহি-আঞ্চলিক অভিনেতাদের জড়িত থাকার এবং এসব দেশের ভূখণ্ডকে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার কারণেই।
ওমান: আস্থা ও মধ্যস্থতার অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত
আরব দেশগুলোর মধ্যে ওমানের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক বিশেষ মর্যাদার। তেহরান ও মাস্কাটের মধ্যে সম্পর্ক সবসময় পারস্পরিক বিশ্বাস ও একে অপরের স্বার্থের প্রতি শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। ওমান শুধু অস্থিতিশীল প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হয়ে ওঠেনি, বরং সংবেদনশীল মুহূর্তে মধ্যস্থতাকারী ও সংলাপের সুবিধাদাতার ভূমিকাও পালন করেছে। আঞ্চলিক সংবেদনশীলতা উপলব্ধি করে দেশটি তার ভূখণ্ডকে ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিকূল কর্মকাণ্ডের প্ল্যাটফর্ম হতে দেয়নি, এবং এই নীতি দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে সুদৃঢ় করেছে। ওমান কার্যকরভাবে দেখিয়েছে যে বিভিন্ন অভিনেতার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় অবদান রাখা সম্ভব।
কাতার: ভারসাম্যপূর্ণ নীতি ও সহযোগিতার সম্ভাবনা
কাতার আরেকটি আরব অভিনেতার উদাহরণ যারা মধ্যস্থতার ভিত্তিতে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অনুসরণ করতে চেয়েছে। ইরান ও দোহার মধ্যে সম্পর্ক কিছু ওঠানামা সত্ত্বেও সাধারণত ইতিবাচক ও সহযোগিতামূলক। ২০১৭ সালে কাতারের অবরোধের সময় ইরান আকাশ ও সমুদ্রপথ খুলে দিয়ে দোহার ওপর চাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই অভিজ্ঞতা সংকটের সময় দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার সক্ষমতা তুলে ধরে।
একইসঙ্গে কাতার সম্পর্কে সমালোচনাও রয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো, দোহার উচিত আরও সতর্ক হওয়া যেন তার ভূখণ্ড ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের প্ল্যাটফর্মে পরিণত না হয়। তবুও সামগ্রিক বিবেচনায় ইরান কাতারকে অঞ্চলের একটি বন্ধুপ্রতিম দেশ হিসেবে দেখে এবং ইতিবাচক সম্পর্ক অব্যাহত রাখার ওপর জোর দেয়। কাতারের মধ্যস্থতামূলক নীতি—যদি তা কৌশলগত স্বাধীনতার সঙ্গে পরিচালিত হয়—তবে সমগ্র অঞ্চলে উত্তেজনা হ্রাসেও ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যান্য আরব দেশ: দ্বন্দ্ব নয়, নির্ভরশীলতাই প্রতিবন্ধকতা
অঞ্চলের অন্যান্য আরব দেশের ব্যাপারেও ইরানের অবস্থান সমানভাবে স্পষ্ট। তেহরান ধারাবাহিকভাবে ঘোষণা করেছে যে আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে তার কোনো সহজাত দ্বন্দ্ব নেই এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভাগ করা স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক সম্প্রসারণে প্রস্তুত। উত্তেজনা সৃষ্টি করে দেশগুলোর মধ্যে কোনো মৌলিক মতবিরোধ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য রেখে নির্দিষ্ট কিছু সরকার কর্তৃক গৃহীত নীতি। যখন সেই সামঞ্জস্য ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের জন্য অবকাঠামো ও ভূখণ্ড সরবরাহের দিকে নিয়ে যায়, তখন ওই রাষ্ট্রগুলো কার্যকরভাবে নিজেদের একটি ব্যয়বহুল কৌশলগত সমীকরণের মধ্যে ফেলে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তায় ইরানের অবস্থান: স্বনির্ভরতার পক্ষে যুক্তি
ইরান মনে করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা অঞ্চলের দেশগুলোকেই নিশ্চিত করা উচিত। সাম্প্রতিক দশকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে বহি-আঞ্চলিক শক্তির উপস্থিতি স্থিতিশীলতা আনে না, বরং সংকটকে আরও জটিল করে তোলে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ থেকে শুরু করে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা—সব কিছুই ইঙ্গিত করে যে বহিরাগত অভিনেতারা প্রায়শই আঞ্চলিক জনগণের নিরাপত্তা ও কল্যাণের চেয়ে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ সুরক্ষিত করতে বেশি উদ্বিগ্ন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল: স্থিতিশীলতার নামে অস্থিতিশীলতা
এই কাঠামোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের কাউকেই অঞ্চলে প্রকৃত টেকসই নিরাপত্তা অনুসরণকারী অভিনেতা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। তাদের নীতি মূলত উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ, অস্ত্র বিক্রি সম্প্রসারণ এবং কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার ওপর ভিত্তি করে গঠিত। এই ধরনের নীতির ফলাফল হয়েছে নিরাপত্তাহীনতা ও অবিশ্বাসের দীর্ঘায়িত হওয়া—এমন একটি অবস্থা যার সর্বোচ্চ মূল্য দিতে হয় আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোকে এবং তাদের জনগণকে।
সম্মিলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা: ইরানের প্রস্তাবিত বিকল্প
বিপরীতে ইরান বারবার পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি সম্মিলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ধারণার ওপর জোর দিয়েছে। এই ধারণা বহিরাগত অভিনেতাদের সম্পৃক্ততা ছাড়াই অঞ্চলের সব আরব দেশের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে গঠিত। এর লক্ষ্য সংলাপ, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত ভুল বোঝাবুঝি প্রতিরোধের প্রক্রিয়া তৈরি করা। তবে এই ধরনের কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি এবং বহিরাগত নির্ভরশীলতা কমানো।
উপসংহার: সহযোগিতার পথেই টেকসই ভবিষ্যৎ
সারকথা, অঞ্চলের আরব দেশগুলোর প্রতি ইরানের নীতি সম্পৃক্ততা, সম্মান ও সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গঠিত—শর্ত থাকে যে এই দেশগুলিও তেহরানের বিরুদ্ধে চাপের হাতিয়ার হয়ে না ওঠে। ইরান দেখিয়েছে যে যেখানে পারস্পরিক রাজনৈতিক ইচ্ছা রয়েছে, সেখানে এটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্পর্ক সম্প্রসারণে প্রস্তুত। আঞ্চলিক নিরাপত্তা এখন আগের চেয়ে বেশি অভ্যন্তরীণ সহযোগিতা এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ থেকে দূরত্বের দাবি রাখে—এটি একটি পথ যা কঠিন হতে পারে, তবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল ও তার বাইরেও একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যতের জন্য এটি একমাত্র টেকসই বিকল্প।
আপনার কমেন্ট